আপনার সন্তানকে কোডিং শেখান

একটা সময় ছিল যখন কম্পিউটার বস্তুটা সহজে হাতের কাছে পাওয়া যেত না। আমাদের দেশে অনেক জ্ঞানী ও গুণী মানুষ রয়েছেন যারা হার্ড কপি পড়ে প্রোগ্রামিং শিখেছেন, স্মৃতি শক্তি কাজে লাগিয়েছেন, সুযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে প্র্যাকটিস করেছেন। আর এখন? হাতের নাগালে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট সবই আছে। আরও আছে গুগল। হার্ড কপির কোন প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। এখন যারা প্রোগ্রামিং শিখছে তাদের সুযোগ অনেক বেশি। সুযোগ বেশি হওয়ায় চারপাশে জিনিয়াস কোডারেরও দেখা মিলছে অহরহ। প্রযুক্তি দিন দিন উন্নতি হচ্ছে সেই সাথে আমাদের ছেলেরাও তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে তো? আপনি যদি সন্তানের অভিভাবক হয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই তার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন। ধরে নিচ্ছি আপনার সন্তানের বয়স ৮ থেকে ১৩। আমি যদি ভুল না করে থাকি, এ সময়টাতে একটা ছেলে অথবা মেয়ের শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে তোলা হয়। আমরাই সে চেষ্টা চালাই। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তাকে প্রোগ্রামিং ভাষা শেখাচ্ছেন তো? ঘাবড়াবেন না, হতেই পারে আপনি প্রোগ্রামিং জানেন না, এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার ছোট ছেলে মেয়েকে উৎসাহ যোগাতে পারেন সহজেই।

ছোট বয়সে প্রোগ্রামিং জ্ঞান নিয়ে বড় হলে ছেলেটির অথবা মেয়েটির যুক্তিসম্মত চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একজন প্রোগ্রামিং জানা মানুষের সাহচার্যে আসলে আপনি বিষয়টা বুঝতে সক্ষম হবেন। আমাদের অনেকের ভুল ধারনা আছে প্রোগ্রামিং মানেই অংক, আর বাচ্চাদের এই জিনিসটা শেখালে তাদের মাথা ছোট বয়সেই খারাপ হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ ভুল। অংক, গণিত যাই বলেন জিনিসটা আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। একটা অংক আপনি হাতে কলমে ও মাথায় চিন্তা করে করবেন, আবার চাইলে সেটা কম্পিউটারকে করতে বলতে পারেন। কম্পিউটারকে বোঝানোর জন্য আলাদা ভাষা রয়েছে, সে ভাষাটাই মূলত শিখতে হয়। ধরুন একটি ওয়েব সাইট। এই যে আপনি লিখাটি পড়ছেন এই ওয়েব সাইটটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রোগ্রামিং ভাষা। আপনার ছোট সন্তানটিকে একটি সাধারণ ওয়েব সাইট বানাতে শেখান, যখন সে একবার শিখে যাবে তখন নতুন কিছু করার উৎসাহ তার ভেতর চলে আসবে। বয়সটাই এমন।

অল্প বয়সে কোডিং করা শিখলে ভবিষ্যতে অসংখ্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে বাধ্য। এমনটি কিন্তু নয় যে আপনার ছেলেকে প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গ্রহন করতে হবে। ওই যে আগে বলেছি, একজন প্রোগ্রামিং জানা মানুষের চাল চলন, কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা সাধারণত ইতিবাচক হয়ে থাকে। পৃথিবীটাকে অন্যভাবে দেখতে শেখে সে। অন্যের পিছনে লেগে থাকা, পরনিন্দা করা, লোক দেখানো স্বভাবের মত তুচ্ছ বিষয়গুলো সে এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়। একটা ছোট্ট তথ্য দেই, ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? মজার বিষয় হলো, কয়েকজন হাই স্কুল স্টুডেন্ট সর্বপ্রথম এই অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করে। নিছক শখের বশে অথবা কোর্সের কোন প্রজেক্টের কাজে তারা এটি তৈরি করেছিল।

বাচ্চাদের যদি স্কিল ডেভেলপ করতে চান তাহলে তাকে প্রোগ্রামিং শিখতে উদ্বুদ্ধ করুন। শুরু করতে পারেন “পাইথন” দিয়ে। পাইথন একটি উচ্চস্তরের প্রোগ্রামিং ভাষা। উচ্চ স্তর মানে কিন্তু সবচেয়ে কঠিন তা নয়। প্রোগ্রামিং ভাষা যত হাই-লেভেলের হবে কোডিং করা তত সহজ হবে। পাইথনের সিনট্যাক্স এবং সিমানটিক্স সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারনে এটি রপ্ত করা অন্যান্য যে কোন প্রোগ্রামিং ভাষার চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজ। যারা প্রোগ্রামিং ভয় পায় তারা শুধু একবার পাইথন চেষ্টা করলে ভয় দূর হয়ে যাবে। যে কোন অপারেটিং সিস্টেমে এটি ব্যবহার করা যায়। এবং ছোটদের প্রোগ্রামিং শেখার জন্য এটাই সর্বোত্তম। নিচে একটি উদাহরণ দেখুন:

a=5
b=14
c=a+b
print(c)

একবার দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে দুটো সংখ্যা যোগ করা হয়েছে। যোগ করার জন্য কম্পিউটারে মাত্র কয়েক লাইনের কোড লিখতে হয়েছে। আমি নিশ্চিত আপনার সন্তান এটা পছন্দ করবে। পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষা শেখার জন্য অংকুর টিম এর করা একটি খুব সুন্দর বই রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা এটি বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এখান থেকে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন। অন্যদিকে আপনি চাইলে আপনার সন্তানকে শেখাতে পারেন ওয়েব ডিজাইন। এর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে যা শেখা বাধ্যতামূলক তা হচ্ছে এইচটিএমএল (HTML)। এক কথায় বলতে গেলে HTML হচ্ছে আপনার ব্রাউজারের মাতৃভাষা। ওয়েব সাইটের ইউজার ইন্টারফেসের প্রায় সবকিছু এটা দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে। ডিজাইনের জন্য HTML এর সাথে সাথে আরও প্রয়োজন হয় সিএসএস (CSS)। আপনার সন্তানকে w3schools.com থেকে এইচটিএমএল শিখতে উৎসাহিত করুন। এটি খুবই সহজ এবং ওয়েব ডিজাইনের বেসিক। তারপর পর্যায়ক্রমে CSS এবং JavaScript শিখতে উদ্বুদ্ধ করুন। একদিন দেখবেন আপনার সন্তান ওয়েবসাইট তৈরি করে আপনাকে চমকে দিবে। ছোট বয়সে এ জাতীয় জিনিস করা সম্ভব, শুধু প্রয়োজন মুক্তভাবে চিন্তা করার পরিবেশ।

যারা খুব ছোট (বয়স ৪ থেকে ৮) তাদের জন্য রয়েছে পিসি ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন।

স্ক্র্যাচ: ২০০৩ সালে MIT এর কয়েকজন শিক্ষার্থী এটি তৈরি করেন। ফোকাস করা হয়েছে বাচ্চাদের প্রোগ্রামিং এ বেসিক জ্ঞান প্রদানের জন্য। খুব চমৎকার এই অ্যাপটি আপনার বাচ্চাকে ব্যবহার করতে দিতে পারেন। খেলার ছলে ডেভেলপ হবে প্রোগ্রামিং লজিক, নিজের অজান্তেই। ডাউনলোড

হপস্কচ: এটা অনেকটা স্ক্র্যাচের মত দেখতে। আপনার সন্তান যদি খেলার জন্য আইপ্যাড ব্যবহার করে তাহলে সেখানে এটি ইনস্টল করে নিতে পারেন। এই অ্যাপটি শুধু মাত্র আইপ্যাডের জন্য। ডাউনলোড

আমি মনে প্রাণে চাই ছোট বয়স থেকেই যুক্তি সম্পন্ন চিন্তা করতে শিখুক আমাদের ছেলে মেয়েরা। আমি বিশ্বাস করি এভাবে একজন ভাল মানুষ হওয়া সম্ভব। যদি ছোট বয়সে প্রোগ্রামিং শেখার ফলাফল হিসেবে জাতি কিছু মেধাবী কোডার পেয়ে যায় তাহলে সেটা বোনাস। সবশেষে বলতে চাই “থিঙ্ক লজিক্যালি এন্ড ডু নো হার্ম”।

More Stories
৪ মাস পর ফ্লোরিডার রাস্তায় যেয়ে কী দেখলাম? কেমন আছে ফ্লোরিডা? | Bangla Vibes
৪ মাস পর ফ্লোরিডার রাস্তায় যেয়ে কী দেখলাম? কেমন আছে ফ্লোরিডা? | Bangla Vibes