অন্তর্যামী

আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙে নতুন কিছু একটা অনুভব করলাম। অনুভূতিটা মনের ভেতরের। মনে হচ্ছিল কারও মনের ভেতর ঢুকে গিয়ে সবকিছু জেনে ফেলা যাবে। বিষয়টা মনে হওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে পরীক্ষা করব বলে মনস্থির করলাম। বারান্দায় লাল চা নিয়ে বসলাম, রাস্তায় লক্ষ করতে থাকলাম।

যেহেতু মাত্র সকাল হয়েছে তাই রাস্তায় কিছু রিক্সা আর মসজিদ ফেরত মুসল্লী ছাড়া মানুষজন নেই বললেই চলে। দু’একজন মুসল্লীর মনের ভেতর প্রবেশের চেষ্টা চালালাম। কে যেন আমার মাথায় কথা বলছে…“বাসায় তো আজ সকালে নাস্তা হবে না, হোটেল থেকে নাস্তা নিতে হবে”, অন্য একজনের মনে চলছে “আজকে যেভাবেই হোক শরীফের টাকাটা পরিশোধ করব”, তৃতীয় মুসল্লীর মনে প্রবেশ করে রীতিমত ধাক্কা খেলাম…“জামিল ভাই আজকে আমার টাকা না দিলে এলাকার মাস্তান দিয়ে ভাল করে ধোলাই দিব”। বুঝলাম যারা হেটে যাচ্ছিলেন তারাই জামিল এবং শরীফ। একে অপরের পরিচিত।

হঠাৎ করে নিজের মাঝে এমন একটা ক্ষমতা আছে অনুধাবন করে ভালই লাগছিল। অফিসের জন্য রেডি হলাম। বের হয়ে রিক্সা ঠিক করতে যাব এমন সময় দেখলাম এক মহিলা একটা স্কুল ড্রেস পরা ছোট্ট ছেলেকে বকতে বকতে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটির কাঁদো কাঁদো চেহারা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি তাদের কথোপকথন শুনতে পেলাম:

মহিলা: খেয়ে আসিস নি, ক্লাসে খিদে লাগলে টিচারের মার খাবি

ছেলে: কেন (কান্নারত অবস্থায়)

মহিলা: আবার কথা বলে! আজ বাসায় গেলেও তোকে খাবার দিব না। তোর বাবা আসুক অফিস থেকে পিটিয়ে ছাল তুলে দিবে পিঠের।

ছেলে: কেন (অতিমাত্রায় কান্নার আাওয়াজ)

শুনতে ভাল লাগছিল না। ভাল লাগার কথাও নয়। বরং মায়া লাগছিল ছেলেটার জন্য। আমি ছেলেটার মনে ঢুকার চেষ্টা করলাম। ছেলেটার মনে যা চলছে….. “মা এমন করছে কেন? আমি তো খেতে চেষ্টা করেছি কিন্তু বমি পাচ্ছিল, মা কেন সেটা বুঝল না। আমি কীভাবে বুঝাবো?”

মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, আমরা বড়রাও তো প্রায়ই না খেয়ে বের হয়ে যাই, মাঝে মাঝে খাওয়ার ইচ্ছা আমাদেরও করে না। একটা ছোট ছেলে; তারও এরকম হতে পারে।

দেরি হয়ে যাচ্ছিল। রিক্সায় উঠে রওয়ানা দিলাম। রিক্সা চালক মধ্য বয়স্ক। কিউরিয়াস মাইন্ড তার মনটাকেও পড়তে চাইল। যেই ভাবা সেই কাজ। জেনে নিলাম সে কি ভাবছে। ফলাফল হিসেবে আমার মনটা আরও উদাস হয়ে গেল। রিক্সা চালক ভাবছিলেন “আজকে সকালে খালি পেটে ছেলেটাকে কাজে পাঠিয়েছি, জানি না আগামীকাল খাবারের ব্যবস্থা হবে কিনা। বউ টা যে কবে মনিবের বাড়ি থেকে ছুটি পাবে!”

অনুধাবন করলাম মন পড়তে পারার এই ক্ষমতা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। পথে দেখলাম এক লোক একটা ১০ বছর বয়সী ছেলেকে মারছে আর অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছে। ছেলেটার চোখ ভেজা তবে জ্বল জ্বল করছে। প্রতিবাদের ইচ্ছা হয়তো। সাহস পেলাম না তার মনে ঢুকে বিষয়টা জানার।

অফিসের কাছাকাছি এসে দেখলাম এক বাবা তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে মর্নিং ওয়াকে বের হয়েছে। মেয়েটি বাবার কোলে লুকিয়ে আছে, উঁকি দিয়ে আমার দিকে চাইছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ঢুকে পড়লাম তার মনের ভেতর। অসাধারণ একটা অনুভূতি পেলাম। ছোট্ট মেয়েটি জানেও না সে ঢাকা শহরের রাস্তার উপর চলছে, সে ভাবছে তার বাবা একটা সুপার হিরো টাইপ কিছু। তার অস্তিত্বের সবকিছুই বাবাকে ঘিরে। খুব বেশি ভাল লেগে গেল। ফেলে আসা ছোট বয়সটাকে মিস করতে থাকলাম। ইস যদি এরকমই হত জীবনটা!

More Stories
ফ্লোরিডা, একটি শীতের বিকেল ও আমরা | Bangla Vibes
ফ্লোরিডা, একটি শীতের বিকেল ও আমরা | Bangla Vibes